অপরাধী, গণধর্ষণের আসামীও নেতৃত্বে : ছাত্রলীগ কি ঐতিহ্য হারাচ্ছে ?

ইয়াসিন চৌধুরী,নিউজ ব্যাংক বাংলা, চট্টগ্রাম :

২০১৭ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম মহানগর বায়েজিদ থানায় দায়েরকৃত একটি গণধর্ষণ মামলার আসামী মো. রুবেল ওরফে রুবেল খান, মামলা নং- ১৯(৫)১৭। এ মামলায় গ্রেফতারও হন তিনি। সেই রুবেল খানকে করা হয়েছে বায়েজিদ থানা ছাত্রলীগের সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক। এমন জঘন্য অপরাধী নেতৃত্বে আসায় চলছে সমালোচনার ঝড়, ক্ষোভ-বিক্ষোভ।

গত ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারী হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ও ১৩ থানা-ওয়ার্ড কমিটি অনুমোদন দেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর। ঘোষিত কমিটি গুলোর মূল নেতৃত্বে এসেছে গণধর্ষণ মামলার আসামী, কিশোর গ্যাং লিডার, হত্যা মামলার আসামী, অস্ত্রধারী, মোবাইল চোর থেকে শুরু করে ছাত্রদল নেতার ভাইও।

২০১৬ সালে সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘মোবাইল ফোন চুরির’ ঘটনায় গণপিটুনির শিকার হন কাজী নাঈম। সেই নাঈমকে কলেজ ছাত্রলীগের আহবায়ক করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ডিসেম্বর মাসে কলেজ ক্যাম্পাসে রাতের আধারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সম্বলিত নিজ দলের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে৷ ব্যানার ছেড়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এছাড়া, নিরীহ পরিবারের উপর হামলা, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে রাঙ্গুনিয়া থানার মামলা নং- ৯(১১)২০ এবং সি.আর ১৩৩/২০ দুইটি পৃথক মামলায় এজাহারনামীয় আসামী কাজী নাঈম।

বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িয়ে রীতিমতো পত্রিকার শিরোনাম হয় কিশোর গ্যাং লিডার সাদ্দাম হোসেন ইভান। দুর্ধর্ষ এই গ্যাং লিডারকে করা হয়েছে চকবাজার ১৬নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি। ২০১৮ সালে নগর পুলিশের তৈরি করা কিশোর গ্যাং তালিকায় ইভানের নাম রয়েছে এক নম্বরে।

২০১৭ সালের ১১ জুন চকবাজার জামান হোটেলের সামনে থেকে বিষ্ণু দাশ নামে এক চিংড়ি ব্যবসায়ীকে ফিল্মি স্টাইলে পিস্তল ঠেকিয়ে তুলে নিয়ে যায় ইভান। মুক্তিপণ আদায়ের পর ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দিলে এ ঘটনায় পাঁচলাইশ মডেল থানার মামলা নং-৭(৭)১৭ দায়ের হয়। এ মামলার প্রধান আসামী ইভান কারাগারে ছিল কিছুদিন।

এছাড়া, তার বিরুদ্ধে হামলা ভাংচুর, অস্ত্র প্রদর্শন, এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে রয়েছে। বেশ কয়েকটি মামলাও হয় চকবাজার থানায়। ক’দিন আগেও তার অনুসারীরা চকবাজারের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালানোর ঘটনার ভিডিও ফুটেজ গণমাধ্যমে প্রচার হয়।

২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর পাঁচলাইশ থানাধীন বিবিরহাট এলাকায় মা’য়ের সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রাজু নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই মো. কুতুবুল আলম বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় মামলা নং-২৩(১১)১৪ দায়ের করেন। এ মামলার আসামী মো. হোসেন ওরফে রবিনকে পাঁচলাইশ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি ২০১৯ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হলে ইতিমধ্যে বিচারকার্য প্রায় শেষ, রায়ের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। এছাড়া ঠিক এক বছর আগে অস্ত্রধারী রাকিব হায়দারকে ডবলমুরিং থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

একই সাথে ওয়ার্ড ছাত্রদলের সম্পাদকের ভাই বেপরোয়া কিশোর গ্যাং লিডার মো. শহীদুল আলমকে চান্দগাঁও থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সেসময় ব্যাপক আন্দোলনের মুখে হস্তক্ষেপ করেন কেন্দ্রীয় সংসদ। তবে দীর্ঘ এক বছরেও তারা চান্দগাঁও ও ডবলমুরিং থানা কমিটির সুরাহা দিতে পারেনি। নতুন করে যুক্ত হয়েছে সদ্যঘোষিত আরো ১৪ কমিটি।

 

ছাত্রলীগ কি ঐতিহ্য হারাচ্ছে ?

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশ জাতির ক্রান্তিকালে অসামান্য অবদান রাখে সংগঠনটি। ‘৫২ ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের হাজারো নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন ঘটনা ও অপরাধীদের হাতে নেতৃত্ব যাওয়ায় দলটি ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, সমালোচনায় উঠে আসছে। ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীরা সংগঠনের ইমেজ রক্ষায় ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দলীয় সভানেত্রীর হস্তক্ষেপ চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *