জননেতা রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী ও শ্রমিক লীগ : মার্চ ১৯৭১

নিউজ ব্যাংক বাংলা ডট কম :

 

২রা মার্চ ১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হয়। ৩রা মার্চ এরই প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলে ঢাকায় ২৩জন,  চট্টগ্রামে ৭৫জন নিহত হয় বিভিন্ন মিছিলে। একটি মিছিল রেল ওয়ে শ্রমিকলীগ আয়োজন করে। সে বিশাল মিছলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী। ভাগ্যক্রমে সেদিন বেচেঁ যান তিনি।

৪ঠা মার্চ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে ১১৩নং সামরিক আইন আদেশ জারি। চট্টগ্রামে নিহতের সংখ্যা ১২১ হয়। চট্রগ্রামের পুরতন রেলওয়ে স্টেশন ও পাহাড়তলি রেলওয়ে স্টেশন রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরীর তেজস্বী ভাষণে প্রকম্পিত চট্টলা।

৫ই মার্চ ছাত্রলীগ ও ডাকসু আহ্বান জানায়।
৬ মার্চের মধ্যে ঢাকা শহরে এবং ৭ মার্চের মধ্যে সারাদেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন শেষ করতে হবে ঘোষণা দেয়। বলা হয়, “প্রতিটি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ১ জন আহ্বায়ক ও ১০ জন সদস্য থাকবে”।

এইদিকে ক্রমশ উত্তাল হতে থাকে সারা বাংলা । তারই ধারাবাহিকতায় উত্তাল বীর চট্টলা। রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরীও দৃঢ় সংকল্প।
এদিকে আবার চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে জনসমাবেশে পুলিশের গুলি বর্ষণ হয়। চট্টগ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয় ১৩৮।
৬ মার্চ ১৯৭১ জাতির উদ্দেশে ইয়াহিয়া খান ভাষণ দেন। ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের ডাকা হয়। জরুরি বৈঠকে বসে আওয়ামী লীগ। বৈঠকে ৭ই মার্চ রেসকোর্চ ময়দানে বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশ্য ভাষণ দেবার সিদ্ধান্ত হয়। সকল জেলার নেতাদের রেসকোর্চের সমাবেশ সফল করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
৬ই মার্চ সন্ধ্যায়  রেলওয়ের একটি টেলিফোনে খবর রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী জানেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার কথা। রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী সাথে সাথে সকল নেতা কর্মীদের ঢাকায় যাবার বার্তা পৌছে দেন এবং এ খবরও জানিয়ে দেওয়া হয় তাদের যে, যাতায়াতের সুবিধার জন্য বিনামূল্য যাওয়ার জন্য ট্রেনে ৩টি বগি যুক্ত করা হয়েছে ।সেই ট্রেনের একটি কম্পার্টমেন্ট ছিল চটগ্রাম শহর ছাত্রলীগের জন্য। যার মধ্যে ছিলেন সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতারা । ফিরোজ, রবিউল, সমির, এনাম, পেয়ার মোহাম্মদ, ইউনুস তরুণ ছাত্রনেতা সফর আলী সহ অনেকেই। প্র‍য়াত এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী, সুলতান আহমদ কন্ট্রাকটার ও মোসলেম উদ্দীন আহমেদও সেদিন রেলস্টেশনে উপস্থিত ছিলেন।
সেদিন রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী নিজে ৩০০-৪০০লোকের এক বিশাল মিছিল নিয়ে ঢাকার ইঞ্চিনিয়ার ইনিষ্টিটিউট হয়ে রেসকোর্স ময়দানে এসে উপস্থিত হন।
সেই ৭ই মার্চে সবার মুখে ছিল “তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব” , “তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলা দেশ” সহ বিভিন্ন স্লোগান।
৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষে বিকেলে চট্টগ্রামে সকল নেতা কর্মীর জন্য পুনরায় বিনামূল্য নিরাপদে চট্টগ্রামের ফিরতে পুণরায় ৩টি কম্পার্টমেন্টের ব্যবস্থা করেন শ্রমিক নেতা রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী।

এদিকে, সাতই মার্চের পর থেকে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে বলাবলি হচ্ছিল, ‘সোয়াত’ নামক একটি জাহাজ আরব সাগর পেরিয়ে বাংলাদেশে তথা চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে । বন্দরে অবস্থিত পাকিস্তানি নৌ-সেনারা এ সম্পর্কে ওয়্যারলেসে যেসব কথাবার্তা বলাবলি করেন, বাঙালি কর্মচারীদের কেউ কেউ তা বুঝে ফেলেন। তারা অস্ত্রের চালান আসার খবরটি বাইরে আওয়ামী লীগ নেতাদের জানিয়ে দেন।

বিষয়টি দ্রুত পুরো শহর ছড়িয়ে পড়লে সর্বস্তরের জনতার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।এইদিকে লোক মুখে বলাবলি শুরু হয় ২০ই মার্চের মধ্যে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ ”সোয়াত”জেটিতে বাধতে পারে। এ অবস্থায় জনতা বন্দর থেকে সেনানিবাস এলাকা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। রহমত উল্লাহ চৌধুরী, আবুল বাশার, আহসান উল্লাহ চৌধুরী, আবুল কালাম, মান্নান সিকদার, নজরুল ইসলাম, ওমর ফারুকসহ অনেক শ্রমিক নেতা সোয়াত জাহাজের অস্ত্র খালাস করতে না দেওয়ার ব্যাপারে সাহসী ভূমিকা রাখেন। সে সময় মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান সহ শ্রমিক-জনতাকে সংগঠিত করার কাজে যেসব শ্রমিকনেতা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রহমত উল্লাহ চৌধুরী। তিনি নিজে উদ্যেগ নিয়ে কয়েকটি ব্যারিকড দেন। এছাড়াও আবুল বাশার, আহসান উল্লাহ চৌধুরী, এস এম জামাল উদ্দিন, আবুল কালাম, মান্নান সিকদার, নুরুল ইসলাম, আবদুস ছাত্তার, ওমর ফারুক, আবদুল নবী চৌধুরী (নবী মিস্ত্রি), শুক্কুর সওদাগর, নূর মোহাম্মদ, মজিদ মিয়া, এনামুল হক প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উল্লেখ্য দীর্ঘ রাজনীতিক জীবনে রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী কোন দিন পদ পদবী কিংবা ক্ষমতার মসনদের তোয়াক্কা করেননি।‌ হয়ত তাই মসনদে বসতে পারেনও নি। রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী তাঁর রেলওয়ে শ্রমিকলীগ নিয়ে অজস্র কর্মসূচি করেন বীর চট্রলার সি আর বিতে। তাই সি আর বি চত্বরকে রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী চত্বর করার আহবান রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী পরিবারের ও রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী ফাউন্ডেশন সংশ্লিষ্ট সকলে।

উল্লেখ্য, ২০০৩সালের ১৭ই মার্চ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক দায়িত্ব থাকা কালীন সময়ে মৃত্যুবরণ করে রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী। ব্যক্তিগত জীবনে অনেক শুভাকাঙ্খী ও গুণগ্রাহী সহ দুই পুত্র ও তিন কন্যা রেখে যান এই বীরমুক্তিযোদ্ধা। নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে জন্ম রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরীকে গরীবুল্লাহ শাহ মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। বর্তমানে রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরীর বড় পুত্র হাবিবুল্ল্যাহ চৌধুরী ভাস্কর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এবং তাঁর মেয়ে রুবা আহসান চৌধুরী কেন্দ্রীয় মহিলা শ্রমিকলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসাবে দায়িত্বরত।

তথ্যসূত্র : সংরক্ষিত
সম্পাদনা : রিয়াজ হায়দার চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *