প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্লিজ, টুঙ্গিপাড়ায় যান

Must Read

প্রায় দুই দশক আগে গভীর রাতে একবার টুংগীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে গিয়েছিলেন। সেসময় রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ বিবেকবান মানুষের প্রশংসায় ভেসেছিলেন। এবার আবার যান, প্লিজ !  –লিখেছেন সাংবাদিক নেতা, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী

প্রায় ১৮ মাস ধরে বুকের মধ্যে একটা ‘ভার ভার’ অনুভব ছিল।

দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর, ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরে দাফায় দফায় আগুন ও  বুলডোজারে ভাঙচুরের জঘন্য অপচেষ্টা, পুলিশ ও সাংবাদিক হত্যা, মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষক লাঞ্ছনা, সনাতনীদের প্রতি আক্রোশ, নারীর প্রতি অসদাচার, মুক্তিযুদ্ধ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা গুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া সহ-সামগ্রিক মব অ্যাটাক কোন সুস্থ বিবেকবান মানুষকেই স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দেয়নি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে সেই ‘ভার ভার’ চাপ আর আগের মত নেই। তবে পুরোটা ভারমুক্ত হইনি এখনও।

মবতন্ত্রের চেয়ে ‘মৃদু গণতন্ত্র’ কিংবা ‘গণতন্ত্রের সূচনা’য় আমরা সুরঙ্গের ওপারে হলেও যেন আলো দেখতে পাচ্ছি। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রী, চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান সালাউদ্দিন আহমেদ এমপি প্রথম দিনেই বলেছেন, মবতন্ত্রের কবর রচনা করবেন। দেশের উদ্বিগ্ন মানুষ এমনই আশা করেছিলেন।

অনেক নাগরিকই আওয়ামী লীগ সহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্য দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে নৈতিক ভাবে সমর্থন দিতে না পারলেও মব-জঙ্গি ত্রাস থেকে দেশকে বাঁচাতে ও ‘রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা’ ইস্যুতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তারেক রহমানের পক্ষেই নৈতিক অবস্থান……….

বাংলাদেশটি যে মহামানব স্বাধীন করেছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামীলীগ গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। শতাব্দীর ল্যান্ডমার্ক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর টানা ক্ষমতা কালে ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিল না। দলটির নেতৃত্ব কিংবা নেতৃবৃন্দ জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে হয়তো অনেক ভুল করেছেন। তাদের ভুল শুদ্ধ বিচারের জন্য বিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া থাকলেও সেই প্রক্রিয়ায় ফলাফলের আগেই দলটির কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ এবং দেশ জুড়ে কার্যালয় ভাঙচুর,অগ্নিসংযোগ ও নাশকতা মব অ্যাটাক করে এবং এসবকে প্রশ্রয় দিয়ে অধ্যাপক ড.  মুহাম্মদ ইউনুস এর নেতৃত্বাধীন সদ্যগত অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ জীবনে হিংসা বিরোধ এবং শত্রুতার নতুনতর বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে গেলেন, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে নিরুপদ্রব রাখবে না বলেই মনে হয়।

গত ১৮ মাসের নাগরিক অস্থিরতা, শংকা ও ভীতির বাংলাদেশে অনেক ষড়যন্ত্র মাড়িয়ে দেশের প্রায় অর্ধেক নাগরিককে ভোটের বাইরে রেখে হলেও গণতন্ত্রের পথ যাত্রার অনিবার্যতায় যে জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল, তাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বিষয়ই ছিলো ডিসাইডিং ফ্যাক্টর ।

আগেও বলেছি, ‘আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে থাকতে পারছে না, তখন স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির বিপক্ষেই নাগরিক হিসেবে আমার অবস্থান। কথায় আছে, ‘শত্রুর শত্রু, প্রকারান্তরে মিত্রই হয়’। ‘রাজাকার’ না ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘পাকিস্তান’ না ‘ভারত’- এরকম প্রশ্নে আমি বরাবরই শর্তহীনভাবেই মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতের সমর্থক।

বাকি অংশ দেখুন নিচে সংযুক্তলেখাটি’র পর…

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও বাংলাদেশটা এমন একটা পর্যায়ে আছে, যেখানে আমার মত অনেক নাগরিকই আওয়ামী লীগ সহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্য দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে নৈতিক ভাবে সমর্থন দিতে না পারলেও মব-জঙ্গি ত্রাস থেকে দেশকে বাঁচাতে ও ‘রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা’ ইস্যুতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তারেক রহমানের পক্ষেই নৈতিক অবস্থান।

বিএনপি’র যেই তারেক রহমানকে অতীতে আমি জানতাম, সেই নেতার প্রতি প্রতিপক্ষের একাধিক অভিযোগের কারনে ক্ষোভ অসন্তোষ থাকলেও সম্প্রতি দেশে ফেরা পরিবর্তিত তারেক রহমান আমার কাছে অনেক বেশি জাতীয় স্বার্থেই  অনিবার্য হয়ে উঠেন।

বঙ্গবন্ধুর দল কিংবা তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্ব যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা জনবান্ধব কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী পরিবেশে নেই, তখন সোজাসাপ্টা আমার মত অনেকেরই পছন্দ তারেক রহমান।

 বাংলাদেশের এমন পরিস্থিতির পেছনে যেসব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কারণ রয়েছে, সেসবের বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে অস্থির অসহিষ্ণু উদ্বেগময় অশনি শংকার বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হঠাৎ ‘এক পশলা বৃষ্টি’র মতই হয়ে আসা তারেক রহমানের হাত ধরে এই বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে প্রকৃত মুক্তি পাক -এমন আশাবাদ একজন রাজনীতি সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি করতেই পারি।

বাকি অংশ দেখুন নিচে সংযুক্তলেখাটি’র পর…

তবে মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোচিত ‘জেড ফোর্স’ কমান্ডার সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি থাকা ও পরবর্তীতে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে বিএনপি’র চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বিনীত অনুরোধ, দেশ গঠনে আপনার এই শুভযাত্রায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে একটু যান। দেশ থেকে ইতিহাস বিকৃতির রাজনীতি দূর করুন, হীন রাজনীতি দূর করতে, রাজনীতিকে দীনতা, দারিদ্রতা মুক্ত করতে টুংগীপাড়ায় যান। নতুবা নিদেন পক্ষে ৩২ নম্বরে ।

প্রায় দুই দশক আগে গভীর রাতে একবার টুংগীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে গিয়েছিলেন। সেসময় রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ বিবেকবান মানুষের প্রশংসায় ভেসেছিলেন।  এবার আবার যান, প্লিজ ! 

 দায়িত্ব নিয়েই আপনি বিভিন্ন মেয়াদে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করা পিতা মাতার কবর জিয়ারত করেছেন। সৌজন্যতা রক্ষা করতে নতুন করে নজির তৈরি করা পদক্ষেপ হিসেবে বিরোধীদলের নেতা, জামায়েত আমির এবং এনসিপি সভাপতির বাসায়ও গিয়েছেন। গেলেন আরো অনেকের কাছে।

নিঃসন্দেহে এমন উদ্যোগ অনুকরণীয়। এসবে প্রশংসায় ভাসা একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ, বাংলাদেশের রাজনীতিকে শিষ্টাচারের নতুন মাত্রা দিতে, ইতিহাস বিকৃতির ঘৃণ্য পথ থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে, বাংলাদেশকে রক্ষা করতে বঙ্গবন্ধুর কাছে যান, টুঙ্গিপাড়ায় যান।

 আশা করি, বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে তাঁর সমাধিতে যাবেন। কেননা, বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীন হয়েছিল । স্লোগান  উঠেছিল, আমার নেতা তোমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’। এই স্লোগান দিয়েই মুক্তি সংগ্রামিরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

আপনি যে সংসদ নেতা হয়ে সংসদে যোগ দিতে যাচ্ছেন, সেই সংসদ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই প্রথম গঠিত হয়েছিল। যে সংবিধান বা আইন প্রণয়নের আপনি এবার প্রধান নেতা সেই সংবিধান বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই তৈরি।

সেদিন টঙ্গীপাড়া বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে যাওয়া প্রশ্নে ঘনিষ্ঠজনদের আপনি বলেছিলেন, ‘ সেখানে কেন যাব না? তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা। আমিও সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর সন্তান। উনার কবরে আমি যেতেই পারি। ‘……..

আমার যতদূর মনে পড়ে, ২১ বছর আগের, সেই ২০০৫ সাল। সেদিন সাংগঠনিক সফরে গোপালগঞ্জ গিয়েছিলেন। হঠাৎ সফর সঙ্গী অন্য কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই গাড়ি ঘুরিয়ে আপনি বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে প্রবেশ করে হাত তুলে মোনাজাত করেছিলেন।
সেই খবর চাপা’ই ছিল। মিডিয়াকে জানতে দেননি। কেননা, আপনি বঙ্গবন্ধুর সমাধি থেকে বের হয়েই আপনি আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার মৃত্যু সংবাদ পান। হয়তো এ কারণে, নতুবা এমনিতেই সেই খবর জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু আপনার সেই শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি রাজনীতি সচেতনদের আপ্লুত করে।

সেদিন টঙ্গীপাড়া বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে যাওয়া প্রশ্নে ঘনিষ্ঠজনদের আপনি বলেছিলেন, ‘ সেখানে কেন যাব না? তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা। আমিও সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর সন্তান। উনার কবরে আমি যেতেই পারি। ‘

আজ তাই ২১ বছর পরে আপনি যখন সরকার প্রধান, তখন ২৪ পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একজন নাগরিক হিসেবে টুংগীপাড়ায় আপনার ফের যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি।

বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গেলে, শ্রদ্ধা জানাতে গেলে, দেশে অসত্য এবং মিথ্যের রাজনীতির কবর রচনা হবে। হীনমন্যতার রাজনীতি দূর হবে। নতুন প্রজন্ম আপনার কাছে এটি চান। দেশ প্রেমিক মানুষ আপনার কাছে এটি চান।

বাংলাদেশ চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করা দল মত এর উর্ধ্বে থাকা সাধারণ মানুষও আপনার কাছে এটি চান।

নতুন দিনে আপনার এই প্রথম প্রশাসনিক যাত্রায় বন্ধ করে দিন জঘন্যতা, বর্বরতা, মিথ্যাচারের সব রাস্তা ।

আপনার যে প্রত্যয় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, তা বিতর্কের বাইরে রাখতে হলেও আপনি টুঙ্গিপাড়ায় যান, প্লিজ! তাছাড়া, এটাই হয়তো আপনার সরকারের টেকসই অগ্রযাত্রার ভিত হতে পারে।

আপনার জন্য অজস্র অতল শুভকামনা। 

( ১৬/০২/২০২৬) ০৪:৩৮

{রিয়াজ হায়দার চৌধুরী :সভাপতি, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রাম, সদ্য সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)

- Advertisement -spot_img

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img
Latest News

গণমাধ্যম বন্দি রেখে কোন নির্বাচন? কেন নির্বাচন?

বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের সাংবাদিকরা একের পর এক গ্রেফতার হয়ে কারাগারে। অনেকেই রাজনৈতিক আক্রোশে মামলার পর মামলায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে...
- Advertisement -spot_img

More Articles Like This

- Advertisement -spot_img