গত দুইটা বছর কখনো ঘর ছাড়া তো, কখনো শহর ছাড়া,, এভাবেই চলছে আমাদের জীবন। এতোটা কষ্ট হয়তো পেতাম না,, যদি না এই তিনটা সন্তান আমাদের সাথে না থাকতো। আমাদের এই ছন্নছাড়া জীবনের অংশ হয়ে গেলো আমার তিন সন্তান। তাদের অনিশ্চিত এই ভবিষ্যত, তাদের পড়ালেখার এই ক্ষতিপূরণ কি দিতে পারবে জুলুমকারী সরকার। এইযে এতো এতো পরিবারের এই কঠিন অবস্থা, এই পরিবার গুলোর সন্তানদের অনিশ্চয়তা,, এমনকি বাবা কে না পেয়ে সন্তানকে নিয়ে যাওয়া,, এগুলোর জবাব দিবে কে?এখন তাদের আসমান কাঁপে না…. আসমান আর আল্লাহ শুধু কি তাদেরই ?

নিউজ ব্যাংক বাংলা : সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে আবেগঘন একটি পোস্ট অনেকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা সোনিয়া আজাদ তার জীবনবন্ধু যুবনেতা আবু নাসের চৌধুরী আজাদ”র আকস্মিক গ্রেপ্তার ও সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের করুন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন ফেসবুকে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক এই ছাত্রনেতার কারাবন্দি দশায় তার পরিবারের সদস্যদের অনিশ্চয়তাচিত্র উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে যেন সারা বাংলাদেশের নির্যাতিতদের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন সোনিয়া।
হুবহু তার সেই বর্ণনাটি তুলে ধরা হলো –
“অবৈধ ইউনুস সরকারের মবের স্বীকার হয়ে পুরো দেশ যখন অতিষ্ঠ, ঠিক সেই সময়টাতে কোন অভিযোগ ছাড়া অন্যায় ভাবে এরেস্ট করা হলো আজাদকে।
ঠিক একবছর আগে অনেকটা আমার কথাতেই ও ঘর থেকে বের হেয়েছিল সেদিন।
একটা বছর ঘর বন্দী, কতক্ষণ একজন এভাবে ঘরে বসে থাকতে পারে। বললাম, কাজটা সেরে আসো, একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসো।
সেদিন প্রচন্ড ঝাল কিছু খাওয়ার ক্রেভিং হচ্ছিল ওর। আমি নাস্তা বানাতে বানাতেই বললাম, তাড়াতাড়ি ফিরে আসো, একসাথে চা খাবো, ইনশাআল্লাহ।
প্রতিবার ও বের হওয়ার সময় দরজা পর্যন্ত গিয়ে আমি বিদায় দেই। আল্লাহর হাওলা করি কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সেদিন ও বের হওয়ার সময় আমার সাথে ওর দেখা হয়নি।
আমি রান্না ঘরের ওর জন্য সব খাবার রেডি করলাম৷ ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ওর কল আসলো…।
ও পাশ থেকে বললো, ‘আমাকে এরেস্ট করেছে। আমি পুলিশের গাড়িতে৷’

পুরো আকাশটা ভেঙে পড়লো আমার মাথার উপর। কোথায় যাবো, কি করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি ভাবলাম, আমার সাথে ফান করছে। বললাম, বাবুরা না খেয়ে তোমার জন্য বসে আছে। তাড়াতাড়ি আসোতো। বাচ্চাদের কিছু বুঝতে না দিয়েই বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম৷ কোথায় যাবো, আমি এখন?……..
‘আমাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছে। পরে কথা হবে তোমার সাথে” , এরপর থেকে মোবাইল বন্ধ ওর।
পুরো আকাশটা ভেঙে পড়লো আমার মাথার উপর। কোথায় যাবো, কি করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
বাচ্চাদের কিছু বুঝতে না দিয়েই বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম৷ কোথায় যাবো, আমি এখন??
যেতে যেতে দুএকজন আপন মানুষকে কল দিলাম৷ তারপর ঠিক থানার সামনে কতক্ষণ আমি দাড়িয়ে ছিলাম, আমি নিজেও জানিনা।
এভাবে রাস্তায় কেটে যায় আমার ভোর চারটা পর্যন্ত৷ এই জায়গাটাই সব থেকে কষ্টের ছিল, ওর সাথে আমার দেখা করতে না পারা।
কারন, আমি দেখা করতে গেলেই আমাকে এরেস্ট করবে নিশ্চিত। বাসায় আমার তিনটা বাচ্চা একা রেখে আসছি৷ ছোট মেয়েটাকে পাঠালাম বোনের বাসায়। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সব থেকে কাছের মানুষটার এই কঠিন সময়ে একটা বারের জন্য তার পাশে যেতে পারলাম না এর থেকে ভয়ানক কষ্ট আর কি হতে পারে!
ফজরের নামাজের সময় আমি বাসায় ফিরলাম। ছেলে গুলো আমার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। কতটা অসহায় ফিল করেছি সেই সময়, তা কেবল আমার আল্লাহই জানেন।
সেই যে সেদিন সকালে নামাজ পড়ে ঘর ছাড়লাম, আর ফেরা হলোনা,,
এই দুই বছরে আর ঠিক আর আগের মতো ঘরে ফেরা হয়নি।
যদিও গত দুইটা বছর কখনো ঘর ছাড়া তো, কখনো শহর ছাড়া,, এভাবেই চলছে আমাদের জীবন।
এতোটা কষ্ট হয়তো পেতাম না,, যদি না এই তিনটা সন্তান আমাদের সাথে না থাকতো।
আমাদের এই ছন্নছাড়া জীবনের অংশ হয়ে গেলো আমার তিন সন্তান।
তাদের অনিশ্চিত এই ভবিষ্যত, তাদের পড়ালেখার এই ক্ষতিপূরণ কি দিতে পারবে জুলুমকারী সরকার।
এইযে এতো এতো পরিবারের এই কঠিন অবস্থা, এই পরিবার গুলোর সন্তানদের অনিশ্চয়তা,, এমনকি বাবা কে না পেয়ে সন্তানকে নিয়ে যাওয়া,, এগুলোর জবাব দিবে কে???
এখন তাদের আসমান কাঁপে না…. আসমান আর আল্লাহ শুধু কি তাদেরই ? যারা ‘লাল স্বাধীনতা’র নামে দেশকে দেশের মানুষকে তলিয়ে দিয়েছে,, পিছিয়ে দিয়েছে আরো একশো বছর পিছনে।। বিনা দোষে যে মানুষ গুলোকে জুলুম করেছে, অন্যায় অত্যাচার করে বিনা অপরাধে অপরাধী করেছে,
তাদের বিচার করবে আল্লাহ, এটা আমি নিশ্চিত।
13/05/2026



